স্ক্যাবিস কি?
Scabies (স্ক্যাবিস) একটি সংক্রামক চর্মরোগ, যা সারকপটিস স্ক্যাবি (Sarcoptes scabiei) নামক একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরজীবী (skin mite) দ্বারা হয়ে থাকে। এই মাইটটি মানুষের চামড়ার নিচে গর্ত করে ডিম পাড়ে এবং তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ির সৃষ্টি করে। স্ক্যাবিস মারাত্মক নয়, কিন্তু খুব অস্বস্তিকর ও ছোঁয়াচে। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হতে পারে।
স্ক্যাবিস রোগের লক্ষণ
১. তীব্র চুলকানি (Severe Itching):
- সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ
- রাতের বেলা চুলকানি অনেক বেড়ে যায়
- গরমে বা ঘাম হলে চুলকানি আরও বাড়ে
২. চামড়ায় ফুসকুড়ি বা লালচে দানা (Rash or Bumps):
- ছোট ছোট গুটি বা ফুসকুড়ি দেখা যায়
- অনেক সময় জলভরা দানা বা ঘা-ও হতে পারে
৩. Skin Burrows (চামড়ায় সুড়ঙ্গের মতো দাগ):
- পাতলা, আঁকাবাঁকা, ধূসর বা সাদা রেখার মতো দাগ
- এটি হলো মাইটের খোঁড়া সুড়ঙ্গ, যেখানে তারা ডিম পাড়ে
- সাধারণত আঙুলের ফাঁকে দেখা যায়
৪. সাধারণত আক্রান্ত জায়গাগুলো:
🔹 প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে:
-
- আঙুলের ফাঁক
- কবজি
- কনুই
- বগল
- কোমর, নাভির আশেপাশে
- স্তনের নিচে (নারীদের ক্ষেত্রে)
- যৌনাঙ্গের আশেপাশে
🔹 শিশুদের ক্ষেত্রে
-
- হাত ও পায়ের তালু
- মুখ, মাথা ও ঘাড়
- নখের নিচেও মাইট থাকতে পারে
৫. চুলকানির কারণে ঘা ও সংক্রমণ (Secondary Infection)
- অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে চামড়ায় ঘা হয়ে যায়
- এতে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে ইনফেকশন হতে পারে (যেমন: Impetigo)
৬. বিশেষ লক্ষণ (জটিল বা বিরল ক্ষেত্রে)
- Nodular Scabies: শক্ত, ব্যথাযুক্ত গুটি
- Crusted Scabies (Norwegian Scabies): গা ঘেঁষে ঘন পুরু খোসা পড়ে যায় (প্রধানত ইমিউন-কম রোগীদের মধ্যে দেখা যায়)
আরও পড়ুন : নিউমোনিয়া কি প্রাণঘাতি? আজই নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করুন।
স্ক্যাবিস কেন হয় ?
স্ক্যাবিস একটি ছোঁয়াচে চর্মরোগ, যা Sarcoptes scabiei নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র পরজীবী (mite) দ্বারা হয়ে থাকে। এই মাইটটি এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। এটি মানুষের ত্বকের ওপর গর্ত করে চামড়ার নিচে প্রবেশ করে এবং সেখানে ডিম পাড়ে। মাইট ও ডিম থেকে তৈরি রাসায়নিক উপাদান শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে উত্তেজিত করে, ফলে চুলকানি, র্যাশ বা ফুসকুড়ি সৃষ্টি হয়।
স্ক্যাবিস সাধারণত ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন, একই বিছানায় ঘুমানো, একই তোয়ালে বা জামাকাপড় ব্যবহার করা, বা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের সংস্পর্শে আসা। এটি যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
বিশেষ করে বাড়ির সদস্য, শিশু, বৃদ্ধ এবং গাদাগাদি করে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে স্ক্যাবিস সহজে ছড়ায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে (যেমন: বয়স্ক, অপুষ্ট, এইডস রোগী) স্ক্যাবিস হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
পরিচ্ছন্নতার অভাব একটি বড় ঝুঁকির কারণ হলেও, পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি এমনকি ধনী পরিবারেও এই রোগ হতে পারে যদি তারা সংক্রামিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে।
স্ক্যাবিসের লক্ষণ যেমন চুলকানি ও র্যাশ দেখা দিতে সময় লাগে (প্রথমবার আক্রান্ত হলে ২–৬ সপ্তাহ), তাই অনেকে বুঝতে না পেরে রোগ ছড়িয়ে ফেলে।
স্ক্যাবিস থেকে মুক্তি পেতে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার ঘনিষ্ঠদের একসাথে চিকিৎসা করা জরুরি। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত কাপড়, চাদর, তোয়ালে গরম পানিতে ধুয়ে ভালোভাবে শুকানো উচিত, যাতে মাইট ধ্বংস হয়।
স্ক্যাবিস এর ছবি

স্ক্যাবিস থেকে মুক্তির উপায়
স্ক্যাবিস একটি ছোঁয়াচে চর্মরোগ, তবে সঠিক চিকিৎসা ও সতর্কতা মানলে এটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য। নিচে স্ক্যাবিস থেকে মুক্তির উপায়গুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:
১. চিকিৎসা গ্রহণ করুন:
- Permethrin 5% cream: রাতের বেলা গা ধুয়ে পুরো শরীরে (ঘাড় থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত) মেখে সকাল পর্যন্ত রাখুন, তারপর ধুয়ে ফেলুন।
- Ivermectin ট্যাবলেট: মুখে খাওয়ার ওষুধ (বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যেমন ছড়িয়ে পড়লে বা Crusted Scabies হলে)।
- Sulfur ointment, Benzyl Benzoate: বিকল্প মলম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২. চুলকানি কমানোর ব্যবস্থা:
- অ্যান্টিহিস্টামিন (যেমন: Cetirizine, Loratadine)।
- Calamine lotion বা ঠান্ডা লাগানো ক্রিম ব্যবহারে আরাম পাওয়া যায়।
৩. পরিবারের সব সদস্যের চিকিৎসা:
- স্ক্যাবিস ছোঁয়াচে, তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্য উপসর্গ না থাকলেও চিকিৎসা নিন।
৪. পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন:
- ব্যবহৃত জামাকাপড়, বিছানার চাদর, তোয়ালে গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকান।
- কমপক্ষে ৭ দিন এসব কাপড় ব্যবহার করবেন না (মাইট মারা যাবে)।
- বিছানা, সোফা, কার্পেট নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
৫. সংক্রমণ রোধে সতর্কতা:
- আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
- ব্যক্তিগত জিনিস (কাপড়, তোয়ালে) ভাগাভাগি করবেন না।
৬. ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যান:
- চুলকানি কমতে ২–৪ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে চিকিৎসার পরেও।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ, কারন ও চিকিৎসা
স্ক্যাবিস রোগের ঔষধের নাম
স্ক্যাবিস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রধান ঔষধ হলো Permethrin 5% cream, যা সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ মলম। এটি রাতে সারা শরীরে মেখে সকালে ধুয়ে ফেলতে হয়। গুরুতর বা ছড়িয়ে পড়া ক্ষেত্রে Ivermectin ট্যাবলেট মুখে খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও Benzyl benzoate lotion, Sulfur ointment (5-10%), ও Lindane lotion (বিকল্প হিসেবে) ব্যবহৃত হতে পারে, তবে কিছুতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হয়। চুলকানি কমাতে Cetirizine, Loratadine বা Diphenhydramine (অ্যান্টিহিস্টামিন) ব্যবহার করা হয়। শিশুরা বা গর্ভবতীদের জন্য চিকিৎসা বেছে নিতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সব সময় পরিবারের সকল সদস্যকে একসাথে চিকিৎসা করা উচিত।
স্ক্যাবিস এর সাবান বা লোশন
স্ক্যাবিসের জন্য বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট সাবান নেই, তবে সংক্রমণ রোধে এন্টিসেপ্টিক সাবান বা ক্লোরোহেক্সিডিন সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। নিয়মিত গোসল এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্ক্যাবিস মাইটো মারা ও চিকিৎসার জন্য মূলত মলম বা লোশন প্রয়োজন।
স্ক্যাবিসের জন্য সবচেয়ে কার্যকর লোশন হলো Permethrin 5% cream। এটি রাতে সারা শরীরে (গলায় নিচ থেকে পা পর্যন্ত) মেখে সকালবেলা ধুয়ে ফেলতে হয়। এছাড়াও Benzyl Benzoate lotion, Sulfur ointment ও Lindane lotion ব্যবহৃত হয়। তবে সব সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা উচিত।
স্ক্যাবিস দূর করার ঘরোয়া উপায়
স্ক্যাবিস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘরোয়া কিছু উপায় আছে, তবে এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসার সাথে সম্পূরক হিসেবে কাজে লাগে। নিচে ঘরোয়া কিছু পদ্ধতি দেওয়া হলো:
- নিমের পাতা বা তেল ব্যবহার:
নিমের তেল বা নিমের পাতা বেটে শরীরে লাগালে পরজীবী দূর হয় এবং চুলকানি কমে। - লেবুর রস:
লেবুর রস ত্বকে লাগালে ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী ধ্বংস হয়। - নারকেল তেল:
নারকেল তেল ত্বক নরম করে এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ রয়েছে। - টী ট্রি অয়েল:
টী ট্রি অয়েল মাইট মারতে সাহায্য করে। তবে ত্বকে আলার্জি হলে ব্যবহার করবেন না। - গরম পানি দিয়ে গোসল:
প্রতিদিন গরম পানিতে গোসল ও ভালো করে শরীর ধোয়া দরকার। - পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা:
জামাকাপড়, বিছানাপত্র গরম পানিতে নিয়মিত ধুয়ে শুকানো। - ত্বক স্ক্রাব করা:
মৃদু হাত দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা মাইট দূর করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: ডায়াবেটিস কি, কেন হয় এবং কত প্রকার ও কী কী
স্ক্যাবিস হলে কি কি খাওয়া যাবে না
স্ক্যাবিস হলে বিশেষ কোনো খাবার সরাসরি নিষিদ্ধ না থাকলেও কিছু খাবার এড়িয়ে চলা উচিত কারণ তা শরীরে প্রদাহ ও চুলকানি বাড়াতে পারে। নিচে সেই খাবারগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
- মশলাদার ও ঝাল খাবার — চুলকানি বাড়াতে পারে।
- তেলযুক্ত ও ফাস্ট ফুড — শরীরের প্রদাহ বৃদ্ধি করে।
- অত্যধিক মিষ্টি ও চিনি — ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করতে পারে।
- অ্যালার্জেন খাবার — যেমন কিছু বাদাম, সামুদ্রিক মাছ (যদি এলার্জি থাকে)।
- অ্যালকোহল — রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন (কফি, চা) — শুষ্ক ত্বক ও চুলকানি বাড়াতে পারে।
পরামর্শ
- বেশি পানি পান করুন, শরীরকে হাইড্রেটেড রাখুন।
- ভিটামিন-সমৃদ্ধ খাবার (ফল, সবজি) খান।
- প্রোটিনযুক্ত খাদ্য যেমন ডাল, মুরগি খান।
- অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি খাবার যেমন হলুদ, আদা গ্রহণ করতে পারেন।
Reference
- Scabies – Symptoms and causes
- Scabies: Causes, Symptoms, Treatment & Prevention
- About Scabies
- Featured Image

Md Ekarm Hossain Bhuiyan is a dedicated zoology graduate with a profound passion for the study of animal life. He completed his primary and secondary education at Ispahani Public School and College, renowned for its commitment to academic excellence. He then pursued his secondary education at Government Science College. After that he achieved graduation at Department of Zoology, Jagannath University. His educational background and enthusiasm for zoology position him to make meaningful contributions to the field of biological sciences in Bangladesh.