Skip to content

আটলান্টিক সনদ কী? এ সনদের মূলনীতি গুলো কী?

আটলান্টিক সনদ কী?

আটলান্টিক সনদ (The Atlantic Charter) হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অন্যতম মাইলফলক। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্বশান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা। ১৯৪১ সালে যুদ্ধের এক সংকটময় মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এই যৌথ ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করেন।

​নিচে আটলান্টিক সনদের প্রেক্ষাপট, মূল বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

​পটভূমি ও ঐতিহাসিক বৈঠক

​১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে যখন ইউরোপে নাৎসি জার্মানির তান্ডব চলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়নি। তবে মিত্রশক্তিকে সহায়তার লক্ষ্যে রুজভেল্ট ও চার্চিল আটলান্টিক মহাসাগরের নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে ‘এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলস’ নামক রণতরীতে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন।

​৯ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই বৈঠকের পর ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সালে তারা একটি যৌথ ঘোষণা প্রদান করেন, যা ইতিহাসে আটলান্টিক সনদ নামে পরিচিত।

​আটলান্টিক সনদের মূল ৮টি নীতি

​এই সনদে আটটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হয়েছিল:

  1. আঞ্চলিক বিস্তার নয়: কোনো দেশই যুদ্ধের মাধ্যমে অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল বা সম্প্রসারণ করবে না।
  2. জনগণের সম্মতি: সংশ্লিষ্ট জনগণের ইচ্ছা ছাড়া কোনো আঞ্চলিক পরিবর্তন করা যাবে না।
  3. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার: প্রতিটি জাতির নিজের পছন্দমতো সরকার পদ্ধতি বেছে নেওয়ার অধিকার থাকবে। (এটি ঔপনিবেশিক দেশগুলোর স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে)।
  4. মুক্ত বাণিজ্য: সকল রাষ্ট্র সমভাবে বিশ্ববাণিজ্যে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে এবং কাঁচামাল আহরণের অধিকার লাভ করবে।
  5. অর্থনৈতিক সহযোগিতা: শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সকল জাতির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে।
  6. ভয় ও অভাব থেকে মুক্তি: নাৎসি শাসনের অবসানের পর এমন এক শান্তি স্থাপন করা হবে, যেখানে সকল মানুষ ভয় ও দারিদ্র্যমুক্ত জীবন কাটাতে পারবে।
  7. সমুদ্রে অবাধ চলাচল: যুদ্ধের পর সমুদ্রপথ সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকবে।
  8. নিরস্ত্রীকরণ: আক্রমণকারী রাষ্ট্রগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় শক্তির ব্যবহার পরিহার করতে হবে।

​গুরুত্ব ও তাৎপর্য

​আটলান্টিক সনদ কেবল একটি কাগজের ঘোষণা ছিল না; এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:

  • জাতিসংঘের ভিত্তি: এই সনদটিই পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (UN) গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
  • মিত্রশক্তির মনোবল: এটি নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত দেশগুলোর মধ্যে একটি আদর্শিক ঐক্য তৈরি করেছিল।
  • ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পতন: সনদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ নীতিটি ভারতসহ এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলোতে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। যদিও চার্চিল এটি মূলত ইউরোপের জন্য বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রুজভেল্ট এটিকে বিশ্বজনীন রূপ দেন।
  • আমেরিকার প্রচ্ছন্ন সমর্থন: এই সনদের মাধ্যমে আমেরিকা পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেয় যে তারা গণতন্ত্র রক্ষায় ব্রিটিশদের পাশে আছে।

​সমালোচনা

​সনদটি আদর্শিক হলেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। চার্চিল শুরুতে এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা উপনিবেশগুলোর (যেমন ভারত) জন্য প্রযোজ্য করতে চাননি। এ নিয়ে তৎকালীন সময়ে ভারতীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া এটি কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তি ছিল না।