Skip to content

World Bank বা বিশ্বব্যাংক বলতে কী বুঝায়?

World Bank (বিশ্বব্যাংক) কী?

বিশ্বব্যাংক হলো একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য হ্রাস, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

  • প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৪ সাল, ব্রেটন উডস সম্মেলন
  • কার্যক্রম শুরু: ১৯৪৬ সাল
  • প্রধান কার্যালয়/সদর দপ্তর: ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র
  • প্রথমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনে কাজ করলেও পরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তায় মনোনিবেশ করে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কাঠামো (৫টি সংস্থা)

বিশ্বব্যাংক একক সংস্থা নয়; এটি “World Bank Group” নামে ৫টি প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি—

১. IBRD

International Bank for Reconstruction and Development

  • মধ্যম আয়ের ও ঋণযোগ্য দেশগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়।
  • বিশ্বব্যাংক এর প্রথম প্রতিষ্ঠান।

২. IDA

International Development Association

  • দরিদ্র দেশগুলোকে খুব কম সুদে বা সুদমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও অনুদান দেয়।
  • বাংলাদেশ দীর্ঘদিন IDA সহায়তা পেয়েছে।
  • Soft Loan Window নামেও পরিচিত।

৩. IFC

International Finance Corporation

  • বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সহায়তা দেয়।

৪. MIGA

Multilateral Investment Guarantee Agency

  • বিদেশি বিনিয়োগে রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা প্রদান করে।

৫. ICSID

International Centre for Settlement of Investment Disputes

  • বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে।

প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বিশ্বব্যাংকের মূল লক্ষ্য দু’টি:

  1. চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ (Extreme Poverty Reduction)
  2. সবার জন্য সমৃদ্ধি বৃদ্ধি (Shared Prosperity)

এর অধীনে তারা কাজ করে—

  • অবকাঠামো উন্নয়ন (রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ)
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
  • কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা
  • ডিজিটাল উন্নয়ন
  • সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

অর্থায়নের উৎস

বিশ্বব্যাংক অর্থ সংগ্রহ করে—

  • সদস্য দেশগুলোর মূলধন অবদান থেকে
  • আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে
  • উন্নত দেশগুলোর অনুদান থেকে

বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশ সংখ্যা ১৮০+

কীভাবে সহায়তা দেয়?

বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেয় তিনভাবে:

১. ঋণ (Loan): স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ঋণ।

২. অনুদান (Grant): ফেরত দিতে হয় না।

৩. কারিগরি সহায়তা (Technical Assistance): নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন।

বিশ্বব্যাংকের মতে সুশাসনের উপাদান কয়টি

বিশ্বব্যাংকের চিহ্নিত সুশাসনের এই ৬টি মূল উপাদান নিচে দেওয়া হলো:

  1. কণ্ঠস্বর ও জবাবদিহিতা (Voice and Accountability): নাগরিকরা তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারছে কি না এবং সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারছে কি না।

  2. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি (Political Stability and Absence of Violence): সরকার অসাংবিধানিক বা সহিংস উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি কতটা কম।

  3. সরকারের কার্যকারিতা (Government Effectiveness): সরকারি সেবার মান এবং আমলাতন্ত্রের দক্ষতা কেমন।

  4. নিয়ন্ত্রণমূলক মান (Regulatory Quality): বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সহায়ক নীতিমালা এবং বিধিবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা।

  5. আইনের শাসন (Rule of Law): সমাজে আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত এবং অপরাধ দমনে বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন।

  6. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ (Control of Corruption): সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা।

অনুন্নত দেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা

১. দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ও আর্থিক সহায়তা

বিশ্বব্যাংক প্রধানত দুটি উইন্ডোর মাধ্যমে ঋণ দেয়:

  • আইডিএ (IDA) সুবিধা: অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংকের ‘International Development Association’ (IDA) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি অত্যন্ত কম সুদে বা শূন্য সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং অনুদান প্রদান করে।

  • অবকাঠামো উন্নয়ন: রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বন্দর নির্মাণের জন্য বড় অংকের ঋণ দিয়ে একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

২. দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন

বিশ্বব্যাংকের মূল লক্ষ্য হলো চরম দারিদ্র্য দূর করা।

  • সামাজিক সুরক্ষা: অনুন্নত দেশগুলোতে দরিদ্র মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি (যেমন: কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা সরাসরি অর্থ সহায়তা) বাস্তবায়নে অর্থায়ন করে।

  • ক্ষুদ্রঋণ: গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে।

৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন

মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়, যা বিশ্বব্যাংক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে।

  • প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষা: শিক্ষা বঞ্চিত এলাকায় স্কুল নির্মাণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান কর্মসূচিতে সহায়তা দেয়।

  • মা ও শিশু স্বাস্থ্য: সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি কর্মসূচি এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বিশাল ভূমিকা পালন করে।

৪. কারিগরি সহায়তা ও নীতি নির্ধারণ

অর্থ সহায়তার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক দেশগুলোকে ‘Expertise’ বা কারিগরি জ্ঞান দিয়ে থাকে।

  • নীতি সংস্কার: একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত করতে এবং বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ গড়তে প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণী পরামর্শ দেয়।

  • প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কীভাবে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা

বর্তমান সময়ে অনুন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

  • অভিযোজন প্রকল্প: সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ, বাঁধ দেওয়া এবং দুর্যোগ সহনশীল কৃষিপদ্ধতি প্রবর্তনে বিশ্বব্যাংক বিশেষ তহবিল সরবরাহ করে।

  • সবুজ শক্তি: কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কমিয়ে সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে উৎসাহিত ও অর্থায়ন করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক—

  • পদ্মা সেতু সংযোগ সড়ক
  • গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন
  • প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন
  • মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচি
  • জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্প

ইত্যাদিতে অর্থায়ন করেছে।

বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের অন্যতম বড় IDA গ্রহীতা দেশ।

সমালোচনা

বিশ্বব্যাংককে নিয়ে কিছু সমালোচনা আছে—

  • কঠোর ঋণ শর্ত
  • নীতিগত সংস্কারের চাপ
  • পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক